৫২বাংলা ডেস্ক | লন্ডন
যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের জন্য স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষা ১৫ বছরে বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে যে উত্তেজনা শুরু হয়েছিল, তা এখন তীব্র মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। হাজারো কেয়ার কর্মী এখন এক অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন -যাদের পাঁচ বা তিন বছরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছিল, তাদের সামনে এখন ১৫ বছরের, এমনকি কোনো নিশ্চয়তা না থাকারও আশঙ্কা।
- বর্তমান আইন আসলে কী বলছে
বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি - এখনো পর্যন্ত আইন বদলায়নি। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ওয়ার্কার ভিসায় থাকা একজন কর্মী টানা পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাস ও কর্মরত থাকলে ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (ILR)-এর জন্য আবেদন করতে পারবেন। ILR পেলে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে আসেন একজন কর্মী, অর্থাৎ নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে আর আবদ্ধ থাকতে হয় না।
তবে সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে 'A Fairer Pathway to Settlement' শিরোনামে একটি নীতি প্রস্তাব প্রকাশ করে, যেখানে সাধারণ অভিবাসীদের জন্য ৫ থেকে ১০ বছর এবং কেয়ার কর্মীসহ RQF লেভেল ৬-এর নিচের পেশাজীবীদের জন্য ১৫ বছরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সংক্রান্ত পরামর্শ প্রক্রিয়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে এবং দুই লাখেরও বেশি মতামত জমা পড়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, পরিবর্তন বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে।এবং চূড়ান্ত নীতি এ বছরের শরতে ঘোষণা করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই নতুন নিয়ম শুধু ভবিষ্যতের আবেদনকারীদের জন্য নয়, বরং যারা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে আছেন তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ আছে; যা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ।
- কেন তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে
হাউস অব কমন্সের হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটির এক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৫ বছরের অপেক্ষায় থাকা কর্মীরা "অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার শোষণের ঝুঁকিতে" পড়বেন। কারণ যুক্তরাজ্যের বর্তমান স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় একজন কর্মীর আইনি অবস্থান সম্পূর্ণভাবে একটিমাত্র নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল। নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করা গেলেও, চাকরি হারালে অভিবাসন মর্যাদাও হারানোর ঝুঁকি থাকে।
ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (TUC)-এর নীতি বিশেষজ্ঞ পিটার ভিল্টশনিগ পার্লামেন্টারি কমিটিকে বলেন, স্পনসরশিপভিত্তিক ব্যবস্থায় "উচ্চ মাত্রার ক্ষমতার অসামঞ্জস্য" তৈরি হয়, যেখানে কর্মীরা সম্পূর্ণভাবে নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো- UNISON-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় শোষণের শিকার কিছু কর্মী আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়েছেন। এই বাস্তবতা থেকেই বোঝা যায় কেন এই ইস্যুটি এত স্পর্শকাতর।
আর্থিক বাস্তবতাও কঠিন- সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সিনিয়র কেয়ার ও কেয়ার কর্মীদের গড় বার্ষিক আয় ২৩,০০০ থেকে ২৬,০০০ পাউন্ডের মধ্যে; যা সাধারণ স্কিলড ওয়ার্কার ভিসাধারীদের তুলনায় প্রায় ১২,০০০ পাউন্ড কম। দীর্ঘ বছর ধরে এত কম আয়ে জীবনযাপন করা এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা - দুই দিক থেকেই তারা চাপের মুখে।
- ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনের অবস্থান
UNISON-এর সাধারণ সম্পাদক অ্যান্ড্রিয়া ইগান এই পরিকল্পনাকে "নিষ্ঠুর, অপ্রয়োজনীয় এবং বাতিল হওয়া উচিত" বলে অভিহিত করেছেন। তার অভিযোগ, যে কর্মীদের সংকটকালে বিশেষভাবে উৎসাহিত করে যুক্তরাজ্যে আনা হয়েছিল, সরকার এখন তাদের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে।
UNISON-এর "ফেয়ার ভিসা ক্যাম্পেইন" ২০২৬ সালে ব্যাপক রূপ নিয়েছে - কেয়ার কর্মী ও সমর্থকরা এমপিদের কাছে লবিং করছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্মিংহাম নির্বাচনী এলাকায় গণহারে লিফলেট বিতরণ করছেন এবং ওয়েস্টমিনস্টারে মিছিল করে হোম অফিসের সামনে প্রতীকী জাগরণ (vigil) পালন করেছেন।
ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ড. ডোরা-অলিভিয়া ভিকল ও ইউনিসনের সামাজিক সেবা বিভাগের প্রধান গ্যাভিন এডওয়ার্ডসও আগেই এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন -তাদের ভাষায় এটি "মুখে চপেটাঘাতের" সামিল।
- এখন কী করণীয়: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলেও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব
এক. বর্তমান নিয়মেই দ্রুত আবেদন করুন। যারা পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করতে যাচ্ছেন বা কাছাকাছি আছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো,নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই বিদ্যমান পাঁচ বছরের নিয়মে ILR আবেদন করে ফেলা।
আইনজীবীদের মতে, ILR-এর মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অধিকার একবার নিশ্চিত হয়ে গেলে তা ভবিষ্যৎ নিয়ম পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত থাকে।
দুই. নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের অধিকার এখনও বহাল। বিদেশ থেকে নতুন কেয়ার কর্মী নিয়োগের পথ বন্ধ হলেও, যুক্তরাজ্যে ইতিমধ্যে থাকা কর্মীরা অন্য কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্পনসরের কাছে চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন। নিয়োগকর্তা শোষণমূলক আচরণ করলে বা স্পনসর লাইসেন্স বাতিল হলে, কর্মীদের হাতে এই বিকল্প খোলা আছে।
তিন. শোষণের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। বেতন রেকর্ড, কর্মঘণ্টার তথ্য, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ এবং যেকোনো অন্যায্য আচরণের দলিল সংরক্ষণ রাখা জরুরি - ভবিষ্যতে আইনি লড়াইয়ে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চার. বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ নিন। ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন Fair Work Agency শ্রমিক শোষণ ও অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব নিচ্ছে। এ ছাড়া UNISON, Citizens Advice এবং বিভিন্ন অভিবাসন আইন সংস্থা বিনামূল্যে পরামর্শ দিয়ে থাকে।
- একটি সম্ভাবনার আলো
তবে সম্প্রতি কিছু আইনি বিশ্লেষণে আশার আলোও দেখা যাচ্ছে। কিছু প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ওয়ার্কার ভিসাধারীদের জন্য পাঁচ বছরের পথ বহাল রাখার কথা বিবেচনা করছে ,বিশেষ করে ব্যাপক জনমত প্রতিক্রিয়া ও সেক্টরের সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত আইন নয় এবং হোম অফিসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যতক্ষণ না চূড়ান্ত ঘোষণা আসছে, ততক্ষণ কোনো কর্মীর উচিত নয় ধরে নেওয়া যে পুরোনো নিয়মই বহাল থাকবে। বরং সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় রেখে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
- প্রয়োজনে সহায়তা নিন
UNISON Fair Visa Campaign: unison.org.uk। Citizens Advice ইমিগ্রেশন হেল্পলাইন বিনামূল্যে পরামর্শ দিয়ে থাকে। স্থানীয় অভিবাসন আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি যাচাই করিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: হাউস অব কমন্স হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটি প্রতিবেদন, House of Commons Library, UNISON, Trades Union Congress (TUC).
ফলোআপ প্রতিবেদন | ৫২বাংলা
-
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার মুহাম্মদ আবদুল মুহিত - পেশাগত পরিচয় কী?
-
বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল শূন্য - ১০ বছর! যুক্তরাজ্যে অক্টোপাস এনার্জির অবিশ্বাস্য অফার
-
যুক্তরাজ্যে শরণার্থী স্পনসরশিপ ভিসা চালুর ঘোষণা, আবেদন শুরু এ বছরেই
-
যুক্তরাজ্যের ছোট গ্রামে ১,২৫০ আশ্রয়প্রার্থী রাখার সিদ্ধান্ত: সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বাসিন্দারা
-
ব্রিটিশ ইতিহাসে প্রথম: রাজা চার্লস প্রকাশ করলেন কত কোটি পাউন্ড কর দিলেন
আরও পড়ুন: