গত দেড় দশকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ক্ষমতাসীন দলের অধিকাংশ সদস্যই সরকারপ্রধান বা মন্ত্রীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন। সরকারের নেতিবাচক দিক যেন তাদের চোখেই পড়তো না। অনেক সময় অতিরিক্ত বন্দনা করতে গিয়ে মন্ত্রীদের নিয়ে গান পরিবেশন ও কবিতা আবৃত্তির ঘটনাও ঘটেছে— এমন অভিযোগও প্রচলিত ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনে এখন সেই সংসদে এসেছে ভিন্ন মাত্রা। দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরাও মন্ত্রীদের তির্যক সমালোচনা করছেন। এ জন্য সরকারের হাইকমান্ডের কাছেও তাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজ দলের এমপিদের মাধ্যমে মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা জবাবদিহির একটি নতুন পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘নিজ দলের মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এমপিদের বক্তব্য অবশ্যই ভালো দিক। অতীতে তো এমন সমালোচনা কমই দেখা যেতো। এ জন্যই শেখ হাসিনা দিনে দিনে স্বৈরাচার হয়ে উঠেছিলেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দল হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই দলের মধ্যেও গণতন্ত্র চর্চা থাকা জরুরি। মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটির যেমন গুরুত্ব রয়েছে, তেমনই সংসদেও সমালোচনার ধারা চালু থাকা উচিত। এতে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। এর মাধ্যমে মন্ত্রীরা আরও সতর্ক হতে পারবেন। এক ধরনের জবাবদিহির চিন্তা মাথায় রেখে তারা পথ চলবেন।’’
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীকেও সরে যেতে হয়েছে এমপিদের সিদ্ধান্তের কারণে। অথচ আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের প্রধানরা যেন ধর্মগুরুর মতো— সবাই শুধু তার বন্দনা করেন। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন এমপি মন্ত্রীদের নিয়ে যে ধরনের সমালোচনা করছেন, এটি অব্যাহত থাকলে তাদের মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
মন্ত্রীদের তির্যক সমালোচনায় সরব ক্ষমতাসীন এমপিরা
অতীতের ধারা ভেঙে এবারের সংসদে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের (বিএনপি) কয়েকজন সংসদ সদস্য কোনও রাখঢাক না করেই নিজ দলের মন্ত্রীদের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরছেন জাতীয় সংসদে। চলতি বাজেট অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের নানা নেতিবাচক দিক নিয়ে সমালোচনা করছেন তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে গয়েশ্বরের টিপ্পনী
গত ২৭ জুন জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে নানা সমালোচনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
তিনি বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের শাসনকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের করা ইয়াবা পাচারকারীদের তালিকায় শীর্ষ নামটি ছিল কক্সবাজারে সেই দলের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নাম। তবে তিনি এখন কারাগারে আছেন।’’ কিন্তু মাদকের বিস্তার এখনও থাকায় আবদুর রহমান বদির দায়িত্ব এখন কে নিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।
সংসদ সদস্য গয়েশ্বর রায় বলেন, ‘‘মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আমাদের দেশে মাদকের সবচেয়ে বড় চালানটা আপনার বাড়ির আশপাশ দিয়ে আসে। আগে শুনতাম বদি, এখন তো বদি নাই। এখন ওখানকার দায়িত্বটা কে নিছে?’’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘‘বাড়ির আশপাশের লোক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তো চেনার কথা। এতদিনে ওদিক দিয়া মাদক আসা বন্ধ হওয়া তো উচিত ছিল।’’
ঋণখেলাপি ইস্যুতে রেজা কিবরিয়ার অসন্তোষ
গত ২৫ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন হবিগঞ্জ-1 আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির এমপি ড. রেজা কিবরিয়া। তিনি বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা IMF-এর হিসাবে ৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ হলেই উদ্বেগ তৈরি হতো। অথচ বাংলাদেশে সেই হার এখন ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে।’’ এসব তথ্য তুলে ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
IMF-এ কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘‘আমি ৩৫টি দেশে কাজ করেছি। আমরা মোট ঋণের ৬ শতাংশ খেলাপি হলে ঘাবড়ে যেতাম। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশ ৬১ শতাংশ। এতে ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণভাবে বেহাল। ব্যাংকের বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ না নিলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি আশা করাটা ভুল।’’ এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যদের টেবিল চাপড়ে তাকে সমর্থন জানাতে দেখা যায়।
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ডিফল্ট সিস্টেম। আমরা ব্যাংকের ডিফল্টের সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছি। আগে ছিল ৯০ দিনে সুদ না দিলে ডিফল্টেড হতো। কিন্তু এখন আমরা এক বছর সুদ না দিলে ডিফল্টেড বলি।’’
সংসদে তোষামোদ সংস্কৃতি বন্ধের আহ্বান
২৯ জুন সংসদে বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘অতীতে এ মহান সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান-কবিতা গাওয়ার ‘ব্যাড কালচার’ বা অপসংস্কৃতি চালু ছিল।’’ তিনি তা পুরোপুরি বন্ধ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘‘সংসদ কোনও তোষামোদের জায়গা নয়, এটি দায়িত্ব পালনের জায়গা। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই পবিত্র সংসদে যেন আর কোনও চরিত্র হননের কাজ না হয়,’’— স্পিকারের প্রতি এমন আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, সবাইকে জবাবদিহির মধ্যে থাকা উচিত।
রাজনীতিতে নতুন বার্তা?
সংসদে মন্ত্রীদের নেতিবাচক দিক নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের সমালোচনাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক নেতারা। তাদের মতে, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আরও সুসংহত হবে এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি জোরদার হবে। মন্ত্রীরাও এক ধরনের নজরদারির মধ্যে থাকবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। যেখানে জবাবদিহির কথা বলা হয়েছিল। আমি মনে করি, এর কিছুটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। অতীতে সংসদে গান পরিবেশন ও কবিতা আবৃত্তি করা হতো। এগুলো মানুষ পছন্দ করতো না। এ জন্য সেই সরকারের পরিণতি তো সবারই জানা। এখনকার সংসদের অনেক সদস্য হয়তো বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন।’’
মানুষ ফল দেখতে চায়
সংসদে মন্ত্রীদের নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের সমালোচনাকে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘‘এগুলো সাধারণ মানুষের মনের কথা। তবে এটাও সত্য তারা এ ধরনের সুন্দর কথার সঠিক বাস্তবায়ন দেখতে চান। এক্ষেত্রে সরকারকে নজর দিতে হবে।’’
তিনি এবারের বাজেটকে ঋণনির্ভর ও ঘাটতির বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এই সংসদ বিএনপি ও জামায়াতের সমঝোতার সংসদ। তারপরও গঠনমূলক সমালোচনা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারকে এই সমালোচনাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ হিসেবে গ্রহণ করে বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
যা বলছেন বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা
মন্ত্রীদের নিয়ে ক্ষমতাসীন এমপিদের এই অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে জামায়াত। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা তো সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করছি। পাশাপাশি আমাদের এমপিরা সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করছেন। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা যদি মন্ত্রীদের অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলতে পারেন, তাহলে এটি ভালো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’’
অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বলেন, ‘‘বিএনপি সব সময়ই গণতন্ত্র চর্চাকে সম্মান করে। তাই মন্ত্রীদের নিয়ে দলীয় এমপিদের সমালোচনাকে ভিন্ন চোখে দেখে না।’’ তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আরও সুসংহত হবে। পাশাপাশি তিনি বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানান।
আরও পড়ুন: