যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন — ILR) জন্য অপেক্ষার সময় ৫ বছর থেকে ১৫ বছরে বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনা ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক অধিকার সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং অভিবাসী কেয়ার কর্মীরা সরকারের এই প্রস্তাবকে 'নিষ্ঠুর', 'অমানবিক' ও 'বিবেকবর্জিত' আখ্যা দিয়ে এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
একই সঙ্গে হোম অফিসের মন্ত্রী মাইক ট্যাপের একটি প্রস্তাবও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে তিনি কেয়ার কর্মীদের এই নতুন কঠোর নিয়মের বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের সঙ্গে প্রকাশ্য মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
- ইতিমধ্যেই বন্ধ বিদেশি নিয়োগের পথ
কেয়ার কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি এমনিতেই কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের ২২ জুলাই থেকে বিদেশ থেকে নতুন কেয়ার কর্মী ও সিনিয়র কেয়ার কর্মী নিয়োগের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। অর্থাৎ এখন থেকে কোনো নিয়োগকর্তা বিদেশ থেকে নতুন কেয়ার কর্মী স্পনসর করতে পারবেন না।
তবে যারা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে কর্মরত আছেন, তারা ২০২৮ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত ভিসা নবায়ন বা নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করতে পারবেন-এটিই তাদের জন্য একমাত্র ক্রান্তিকালীন সুযোগ। এই সময়ের পরে কেয়ার সেক্টরের জন্য বিদেশি নিয়োগের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে নতুন আবেদনকারীদের জন্য ইংরেজি ভাষার দক্ষতার মান B1 থেকে বাড়িয়ে B2 করা হয়েছে - যদিও বর্তমানে কর্মরতদের ক্ষেত্রে এই কঠোরতা প্রযোজ্য নয়।
- নির্ভরশীল পরিবার আনার সুযোগও সীমিত
২০২৪ সালের মার্চ থেকে নতুন কেয়ার কর্মী ভিসা আবেদনকারীরা স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের সঙ্গে আনতে পারছেন না। আগে যাদের নির্ভরশীল সদস্যের ভিসা অনুমোদিত হয়েছিল, শুধু তারাই এই সুবিধা বহাল রাখতে পারবেন। ফলে নতুন করে আসা কেয়ার কর্মীদের জন্য পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকা এখন বাস্তবতা।
- ১৫ বছরের প্রস্তাব: কেন এত আশঙ্কা
সরকারের নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাধারণভাবে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে স্বল্প ও মধ্যম দক্ষতার পেশায় কর্মরতদের জন্য, যার মধ্যে সামাজিক সেবা বা কেয়ার সেক্টরও রয়েছে, এই সময়সীমা ১৫ বছর পর্যন্ত নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া এই সংক্রান্ত পরামর্শ প্রক্রিয়ায় দুই লাখেরও বেশি মতামত জমা পড়েছে।
এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে মাইক ট্যাপ একটি নিবন্ধে বলেন, অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের ক্ষেত্রে এই নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। কারণ তারা যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতের সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
তার এই অবস্থানের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের কাছে মাইক ট্যাপকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সংবেদনশীল সরকারি নথি ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তার প্রবেশাধিকারও সীমিত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি সরকারের প্রস্তুতাধীন অভিবাসন নীতির তথ্য ফাঁস করেছিলেন।
- শ্রমিক সংগঠনের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের প্রধান নির্বাহী ড. ডোরা-অলিভিয়া ভিকল বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রয়োজনেই এসব মানুষ বৈধভাবে দেশটিতে এসেছেন। এখন নিয়ম পরিবর্তন করে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেওয়া শুধু নিষ্ঠুরই নয়, একটি লেবার সরকারের জন্যও তা অত্যন্ত বিবেকবর্জিত সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নিলে এই পরিকল্পনাটি বাতিল করাই হবে সবচেয়ে সঠিক পদক্ষেপ।
অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন ইউনিসনের সামাজিক সেবা বিভাগের প্রধান গ্যাভিন এডওয়ার্ডস বলেন, যারা যুক্তরাজ্যের একটি অত্যাবশ্যকীয় জনসেবা খাতকে সচল রেখেছেন, তাদের জন্য মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন করা মুখে চপেটাঘাতের সামিল। তার মতে, বর্তমান স্পনসরশিপভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থার কারণে কর্মীরা নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে আবদ্ধ থাকেন। ফলে অনেক নিয়োগকর্তা এই সুযোগে ভয়ভীতি প্রদর্শন, কম বেতন দেওয়া, অতিরিক্ত কাজ করানোসহ নানা ধরনের শোষণ চালিয়ে থাকেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালেই হোম অফিস প্রায় ২,০০০ স্পনসর লাইসেন্স বাতিল করেছে - যার বড় অংশই কেয়ার খাতের নিয়োগকর্তা। লাইসেন্স বাতিল হলে কর্মীদের নতুন স্পনসর খুঁজে নিতে মাত্র ৬০ দিন সময় থাকে, যা অনেক কর্মীর জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
- জোসেফিনের গল্প: শোষণ আর নীরবতার বাস্তবতা
নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেইসব কেয়ার কর্মীরা, যারা ইতোমধ্যেই পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
জিম্বাবুয়ে থেকে ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে আসা এক কেয়ার কর্মী (ছদ্মনাম জোসেফিন) জানান, চাকরির শুরুতে তাকে নিয়োগকর্তার বাড়ির বাগানের একটি কাঠের ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। রাতে টয়লেটের পরিবর্তে একটি বালতি ব্যবহার করতে হতো এবং গোসলের জন্যও সীমিত পরিমাণ পানি দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে আসতে নিজের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে এবং স্বজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। চাকরি হারানোর ভয়েই তিনি দীর্ঘদিন মুখ খুলতে পারেননি।
বর্তমানে তার স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার আর মাত্র ১০ মাস বাকি। কিন্তু সরকারের নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাকে আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
তার ভাষায়, "আমি আমার কাজকে ভালোবাসি। সমাজের জন্য অবদান রাখতে চাই। কিন্তু এখন আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছি।"
- কার্লার গল্প: বিরামহীন কাজের চাপ
নাইজেরিয়া থেকে ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে আসা আরেক কেয়ার কর্মী (ছদ্মনাম কার্লা) জানান, অনেক সময় তিনি টানা এক মাসও কোনো ছুটি ছাড়াই কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোরে কাজ শুরু করে রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে নিজের কিশোরী মেয়ের সঙ্গেও সময় কাটানোর সুযোগ পান না।
তার অভিযোগ, অতিরিক্ত কাজের চাপে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লেও ভিসার কারণে প্রতিবাদ করার সাহস পান না। কারণ চাকরি হারালে যুক্তরাজ্যে থাকার সুযোগও হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
কার্লা বলেন, নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাকে আরও দীর্ঘ সময় একই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে, যা তিনি অমানবিক বলে মনে করেন।
- কেন আশার আলো কম দেখছেন কর্মীরা
কেয়ার কর্মীদের অসন্তোষ ও হতাশার পেছনে একাধিক বাস্তব কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বিদেশি নিয়োগের পথ ইতিমধ্যে বন্ধ হওয়ায় নতুন কর্মীরা একেবারেই আসতে পারছেন না, ফলে যারা আছেন তাদের ওপর কাজের চাপ আরও বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে ভিসা আবদ্ধ থাকায় কর্মীরা প্রতিবাদ করলে চাকরি ও বসবাসের অধিকার দুটোই হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। তৃতীয়ত, সরকার একাধিকবার বলেছে প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরও এগিয়ে আনা হতে পারে, যা কর্মীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেয়ার খাতে দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাজ্য সরকার। এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিলে নতুন কর্মী আকর্ষণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফলে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য এবং সামাজিক সেবা খাতের জনবল সংকট — এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন কিয়ার স্টারমার বা নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এ বছরের শরতে ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, House of Commons Library, NHS Employers, Chambers and Partners
৫২বাংলা | 52banglatv.com
-
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার মুহাম্মদ আবদুল মুহিত - পেশাগত পরিচয় কী?
-
বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল শূন্য - ১০ বছর! যুক্তরাজ্যে অক্টোপাস এনার্জির অবিশ্বাস্য অফার
-
যুক্তরাজ্যে শরণার্থী স্পনসরশিপ ভিসা চালুর ঘোষণা, আবেদন শুরু এ বছরেই
-
যুক্তরাজ্যের ছোট গ্রামে ১,২৫০ আশ্রয়প্রার্থী রাখার সিদ্ধান্ত: সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে বাসিন্দারা
-
ব্রিটিশ ইতিহাসে প্রথম: রাজা চার্লস প্রকাশ করলেন কত কোটি পাউন্ড কর দিলেন
আরও পড়ুন: