ইসরায়েলের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ছয় দশকের মধ্যে এই প্রথম ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে মুসলিমদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। মসজিদের আশপাশের সড়ক ও ফুটপাতে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করলে মুসল্লিদের ওপর স্টান গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী।
১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম ঈদুল ফিতরের দিনে আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখা হয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পুরো মসজিদ চত্বর বন্ধ করে দিলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিরা বন্ধ স্থাপনার যতটা সম্ভব কাছাকাছি অবস্থান নেন।
ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আল-আকসার খতিব ও জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইকরিমা সাবরি একটি ধর্মীয় নির্দেশনা জারি করেন। তিনি মুসলিমদের মসজিদের নিকটবর্তী স্থানে ঈদের নামাজ আদায়ের আহ্বান জানান।
শুক্রবার (২০ মার্চ ২০২৬) সকালে ইসরায়েলি পুলিশ জেরুজালেমের ওল্ড সিটির প্রবেশপথে ব্যারিকেড বসালে শত শত মুসল্লি বাইরে নামাজ পড়তে বাধ্য হন। এ সময় আল-আকসার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের ওপর স্টান গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আল-আকসা মসজিদ চত্বর কার্যত সিলগালা করে রাখা হয়। ফলে হাজারো ফিলিস্তিনি ওল্ড সিটির ফটকের আশপাশে জড়ো হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
ফিলিস্তিনিদের মতে, এটি ইসরায়েলের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তাঁদের অভিযোগ, নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আল-আকসা মসজিদ চত্বরে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে চায় ইসরায়েল।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জেরুজালেমে মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতাদের গ্রেপ্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের বারবার অনুপ্রবেশও লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশ নামাজের সময়সহ বিভিন্ন সময়ে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে মানুষকে আটক করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
বিবর্ণ ঈদ আনন্দ
ঈদের আগের সময়গুলোতে জেরুজালেমের ওল্ড সিটি সাধারণত ফিলিস্তিনিদের ভিড়ে প্রাণচঞ্চল থাকে। কিন্তু এবারের ঈদে ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে শহরটি ছিল প্রায় জনশূন্য। রাস্তাঘাটে দেখা গেছে অস্বাভাবিক নীরবতা।
ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ দোকানপাট খোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কেবল ফার্মেসি ও জরুরি খাদ্যদ্রব্যের দোকান চালু রাখার অনুমতি ছিল। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ কারণে তারা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
আল-আকসা মসজিদ বন্ধ এবং বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে মুসল্লিদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে Organisation of Islamic Cooperation, Arab League এবং African Union Commission। এক যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাগুলো জানায়, এই পদক্ষেপ দখলকৃত জেরুজালেমের ইসলামি ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনি স্থিতাবস্থার গুরুতর লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘দখলদার শক্তি হিসেবে এই অবৈধ ও উসকানিমূলক পদক্ষেপের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির সব দায় ইসরায়েলকেই নিতে হবে।’ সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে তা সহিংসতা ও উত্তেজনা বাড়াবে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে।
গাজায় ধ্বংসস্তূপে শোক আর আনন্দ
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। চলমান বৃহৎ পরিসরের সংঘাতের ছায়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। গাজায় ইসরায়েলি হামলা আগের তুলনায় কিছুটা বিক্ষিপ্ত হলেও থামেনি। এর মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহরগুলোতে লাখো মানুষ ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করছেন।
গাজায় এবারের ঈদ যেন চরম বৈপরীত্যের প্রতীক। শোক ও ক্ষণস্থায়ী আনন্দ, ক্ষুধা ও উদ্যাপন, আর বিলাপের সঙ্গে মিশে আছে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে দেইর আল-বালাহতে আশ্রয় নেওয়া দুই সন্তানের জননী সাদিকা ওমর (৩২) বলেন, ‘ঈদের আনন্দ এবার অপূর্ণ। আমাদের কেউ ঘর হারিয়েছে, কেউ হারিয়েছে পরিবারের সদস্যকে। আমার স্বামী দূরে আছেন, সীমান্ত পারাপার বন্ধ থাকায় তিনি গাজায় ফিরতে পারছেন না। তবু আমরা যতটা সম্ভব ধর্মীয় শিক্ষা অনুসরণ করার চেষ্টা করছি।’
গাজায় এই সীমিত উদ্যাপনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য হারানোর গল্প। অনেক মা সাম্প্রতিক হামলায় নিহত সন্তানদের জন্য শোক পালন করছেন। আবার কেউ কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই নীরবে ঈদ কাটাচ্ছেন—যাঁদের একমাত্র সম্বল এখন স্মৃতি।