২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ বাস্তবে আবারও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে এসেছে—এমন মত প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যাকে গণঅভ্যুত্থানের মাস্টার মাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন। ‘লীগ একটি ধর্মতত্ত্ব’—পোস্টের শুরুতেই বক্তব্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মাহফুজ আলম পোস্টের শুরুতেই লেখেন, “লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে। কীভাবে ফিরল, সে গল্পই বলব আজ।” এরপর তিনি বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের পুনরাগমনের একটি বিশদ তালিকা উপস্থাপন করেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষণ মাহফুজ আলম লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ২৪-কে ৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থীদের উত্থানের জন্য অন্তরিণ সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে। যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ।” উগ্রবাদ, মব জাস্টিস ও সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রসঙ্গ দেশে সাম্প্রতিক মব জাস্টিস ও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি লেখেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে মজলুমগণ চুপ ছিল।” তিনি আরও যোগ করেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেক্যুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এ দেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এ দেশে হিরো বানানো হয়েছিল। উগ্রবাদীর সেফ স্পেইস দেওয়া হইসিল।” অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা পোস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যূনতম সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে বিএনপি ও * অন্তরিণ সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর বিএনপি ও * ঠেকাতে জামাতকে কোলে নিল অন্তরিণ।” আমলাতন্ত্র ও ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ইস্যু সরকারের অভ্যন্তরে আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বৃদ্ধির সমালোচনা করে তিনি লেখেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরিণ সরকার পলিটিক্যাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হলো এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হলো। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামায়াত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল, নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।” ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অভ্যুত্থান-পরবর্তী ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন মিডিয়া আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা প্রযোজিত হলো।” তিনি আরও বলেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের বদলে সংঘতন্ত্র জয়ী হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন নতুন মিডিয়া অনুমোদনে বাধা দেওয়ার জন্য একজোট হইসিল কিচেন ক্যাবিনেট। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন জুলাই ঘোষণাপত্র কিংবা সনদের প্রক্রিয়া তুলে দেওয়া হইসিল আমলাতন্ত্র আর ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের হাতে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন বাম-শাহবাগী পিটাইলে আনন্দ পেয়েছিল মজলুমগণ।” সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সমালোচনা দেশের চলমান সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়েও তিনি কড়া মন্তব্য করেন। লিখেছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন এদেশে কাওয়ালি বা ইনকিলাবি কালচারের মতন রিগ্রেসিভ কালচার- ব্যবস্থা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোকাবেলার মহারম্ভ হয়েছিল।” রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ‘বার্গেইনিং টুল’ অভিযোগ পোস্টের শেষাংশে তিনি অভিযোগ করেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনি বাঁটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো অ্যান্ড বিএনপি-জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কমিশন, ট্রাইব্যুনাল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে একটি আদেশ বা আদর্শের লোকদের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের বার্গেইনিং টুলে পরিণত করা হল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা জুলাইয়ে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তাদের বাদ দিয়ে জিরো কন্ট্রিবিউশন গুপ্তদের ক্ষমতায়িত করা হলো।” ‘এই তালিকা আরও বাড়বে’ আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পেছনে আরও কারণ রয়েছে—এমন ইঙ্গিত দিয়ে পোস্টের শেষ লাইনে মাহফুজ আলম লিখেছেন, “এই তালিকা আরও বাড়বে...”