দেশে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হলেও থামছে না হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, সম্প্রতি শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দৃশ্যমানভাবে কমতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, বুধবার হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি ৩ জন হামের উপসর্গে মারা গেছে।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮১। এর মধ্যে ৮০ জনের মৃত্যু সরাসরি হামের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
হাসপাতালগুলোতে বিশেষ নির্দেশনা
দেশজুড়ে হাম রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আলাদা ওয়ার্ড বা কেবিন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাম ও সন্দেহজনক রোগীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইনের আওতায় ১০ শতাংশ শয্যা দরিদ্রদের জন্য সংরক্ষণের নিয়ম থাকলেও এর মধ্যে ৫ শতাংশ শয্যা হাম রোগীদের জন্য নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে আরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিশ্চিত করা, প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের রাউন্ড, রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি দর্শনার্থী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিদিন এমআইএস সার্ভারে তথ্য আপলোড করা।
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বাস্থ্য সচিবকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৯ মে) বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
রুলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (UNICEF) এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা অনুসন্ধানে ইনকোয়ারি কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
রিট ও আইনজীবীর বক্তব্য
একই বিষয়ে আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ পৃথক রিট দায়ের করেছেন। রিটে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “দেশে গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে ২০ মে পর্যন্ত সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অকল্পনীয়।”
তিনি আরও বলেন, “হঠাৎ করে কেন হামের প্রাদুর্ভাব এভাবে মহামারি আকার ধারণ করল, সে বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
টিকা কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মত
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. গোলাম সারোয়ার বিদ্যুৎ বলেন, “সরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের ৯৫ শতাংশই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “টিকা রোগ সারিয়ে তোলে না, কিন্তু রোগের ভয়াবহতাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করে।”
তার মতে, দেশে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশে পৌঁছানোয় মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে এবং দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
টিকার ঘাটতি নিয়ে UNICEF-এর সতর্কতা
হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। তিনি জানান, টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং অন্তত ১০টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমার সামনে হয়ত সবগুলো তারিখ এখন নেই এবং আমার ধারণা, সেটা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে আমি জানি ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ কি ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “বলেছি, ‘আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমি চিন্তিত যে, আপনারা ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছেন’।”
প্রাদুর্ভাবের পেছনের কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকা ঘাটতি নয়, বরং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও পরিস্থিতিগত কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়াগত জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “সুতরাং টিকা কিনতে না পারার কারণে প্রাদুর্ভাব হয়েছে তা না। বাংলাদেশে ঘটতে থাকা বিভিন্ন কারণে এটা হয়েছে। তবে আমাদেরকে সঠিক পর্যালোচনার দিকে তাকাতে হবে।”
জরুরি টিকাদান কর্মসূচি
নতুন সরকারের উদ্যোগে UNICEF, WHO, Gavi এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহযোগিতায় জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
৩০টি উচ্চ ঝুঁকির উপজেলায় শুরু হওয়া এই কর্মসূচি পরে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি ১০ মে নাগাদ প্রায় শতভাগ সফলতা অর্জন করে।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো উদ্বেগজনক হলেও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে। তবে টিকা সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যখাতের সমন্বয় নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
-
শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকার : গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে দেশে ফিরব
-
আ.লীগের ব্যাক করা নিয়ে মাহফুজের পোস্ট, যা লিখলেন
-
প্রবাসীকে বাসায় ডেকে হত্যা: প্রেমিকার হাতে ভয়াবহ খণ্ডিত লাশ
-
তনু হত্যা মামলায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য: ডিএনএ পরীক্ষায় আরও এক পুরুষের রক্ত শনাক্ত
-
ছাত্রদল-এনসিপি উত্তেজনা, চট্টগ্রাম নগরীতে মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ