তীব্র গরমের মধ্যে একদিকে লাগাতার লোডশেডিং, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ডিজেল সংকট—এই দ্বিমুখী চাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিন-রাত অব্যাহত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চলমান বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দাম বাড়লেও পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে না। জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে বোরো আবাদ নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের ভাষ্য, দাম বাড়লেও ডিজেলের সংকট কাটেনি। ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ১৫-২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার ডিজেলচালিত সেচ পাম্প অচল হয়ে রয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় বিঘাপ্রতি সেচ ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ না থাকায় বৈদ্যুতিক পাম্পও চালানো যাচ্ছে না। ধানের ফুল আসা ও দানা বাঁধার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ না দিতে পারলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
রাজশাহীতে ৪৬টি তেল পাম্পের মধ্যে প্রতিদিন মাত্র ৮ থেকে ১০টি চালু থাকছে, বাকিগুলো বন্ধ। যেসব পাম্পে তেল মিলছে, সেগুলোতেও দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে; অনেকেই রাত থেকেই অপেক্ষা করছেন। কৃষকেরা তেল না পেয়ে সেচ দিতে পারছেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বোরো চাষিরা শ্যালোমেশিন নিয়ে পাম্পে তেল নিতে আসছেন। বালানগর ও কালচিকার কৃষক কালাম ও কোরবান আলী জানান, পাম্পে তেল না পাওয়ায় অনেক সময় বাড়ির মোটর দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। আবার জমিতে পাইপ বসানোর পরও বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো আবাদে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে জাতীয় খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে জেলার প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার সেচ পাম্প অচল রয়েছে।
শ্যালোমেশিন মাথায় করে পাম্পে আসা কৃষক রাকিব হোসেন জানান, ফিলিং স্টেশন থেকে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা সেচ দেওয়া সম্ভব। অথচ তার জমিতে নয় ঘণ্টা পানি প্রয়োজন। তাই প্রতিদিন অল্প অল্প তেল কিনে সেচ দিতে হচ্ছে।
পদ্মা অয়েল কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আগের মতোই প্রায় তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে চাহিদা অনেক বেড়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। বিপিসি দৌলতপুর থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এখন সড়কপথে তিনগুণ ব্যয়ে তেল আনতে হচ্ছে।’
ডিজেল সংকটের পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক এলাকায় সেচ কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে চার হাজারের বেশি সেচ পাম্প অচল হয়ে পড়েছে এবং ফসল উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চকরিয়া উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও সদর উপজেলায় মোট ৭,১৪৬টি সেচ পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ডিজেলচালিত এবং বাকি ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও ডিজেল উভয় ব্যবস্থায় চলে। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে অধিকাংশ পাম্পই ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না।
কৃষি সমিতির নেতাদের তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে চার হাজার ২০০টির বেশি সেচ পাম্প বন্ধ রয়েছে। ফলে অন্তত ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যেখানে এ বছর ৫৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।
বরিশাল অঞ্চলে প্রায় চার লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের সেচ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে মাঠের তরমুজ ফসল নিয়েও উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
জামালপুরে ডিজেল সংকটে সেচ ও চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কৃষকেরা তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। অনেক ক্ষেতেই কয়েকদিন ধরে ডিজেলচালিত পাম্প বন্ধ রয়েছে। পানির অভাবে জমিতে ফাটল দেখা দিয়েছে, ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে।
কৃষক আজমত আলী, দিদার আলী ও মোফাজ্জল হকসহ অনেকে অভিযোগ করে বলেন, কৃষিকাজের ব্যস্ত সময়ে ডিজেল না পাওয়ায় শাকসবজি, পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা ও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও সেচযন্ত্র বন্ধ থাকায় কাজ করা যাচ্ছে না। অনেক সময় রাতভর লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
নূরজাহান ফিলিং স্টেশনের মালিক মো. সুমন মিয়া বলেন, ‘আমরা সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছি, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।’
সরিষাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপ সিংহ জানান, কৃষকদের ফুয়েল কার্ডের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে। ডিজেল সংকটের কারণে সেচ প্রকল্প ও কৃষিযন্ত্র চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নান্দাইলে দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কৃষক রাত জেগে বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকছেন।
কৃষি অফিস বলছে, বোরো ধানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেচে বিলম্ব হলে ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রংপুরে জ্বালানি সংকটে কৃষিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে, জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন দ্রুত ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেছেন।
কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ পাম্প দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকছে। দেবীদ্বারের কৃষক মোতালেব মিয়া জানান, ধানের শিষ বের হওয়ার পর নিয়মিত পানি প্রয়োজন হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জমি শুকিয়ে যাচ্ছে এবং ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
-
সংরক্ষিত নারী আসন : বিএনপির এমপি হলেন যারা
-
‘আমরা নারী’ ও ‘ইউনিকো হসপিটালস পিএলসি’-এর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর
-
বিএনপির কাউন্সিল : দলপ্রধানের পদ ছাড়ছেন তারেক রহমান?
-
জিয়ার হাতে ধানের শীষ তুলে দেন ভাসানী, তারেক রহমানের বক্তব্য নিয়ে মাঠ গরম করছে কারা?
-
বিতর্কের মধ্যেও ‘মঙ্গল’ থাকছে—বর্ষবরণের নানা আয়োজনে