ঢাকা ২ চৈত্র ১৪৩২, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
ঢাকা ২ চৈত্র ১৪৩২, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ
আরব আমিরাতে বাংলাদেশিসহ ৩৫ জন গ্রেপ্তার শব্দের চেয়ে ১৩ গুণ দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলে ইরানের হামলা, দুবাই বিমানবন্দরে ফ্লাইট স্থগিত অস্কারে সেরা সিনেমা ডিক্যাপ্রিওর ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রকাশ্যে গুলি: কলেজছাত্রকে হত্যা ৪২ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রশাসক বসালো সরকার মার্কিনীদের মধ্যপ্রাচ্যের ১২ দেশ ছাড়ার আহ্বান, হরমুজ রক্ষায় ট্রাম্পের উদ্যোগে ফ্রান্সের না মব করে পুলিশে দেওয়া পঙ্গু আ.লীগ নেতা মারা গেলেন কারা হেফাজতে ইরানের জ্বালানিসমৃদ্ধ খার্ক দ্বীপে ভয়াবহ মার্কিন হামলা, চরম প্রতিশোধের শঙ্কা এবার স্থল যুদ্ধে আসছে ২,৫০০ মার্কিন সেনা, ‘উভচর’ যুদ্ধজাহাজ : মোজতবাকে ধরিয়ে দিতে কোটি ডলার পুরস্কার সিঙ্গাপুরে নেওয়া হচ্ছে মির্জা আব্বাসকে আকাশযুদ্ধে ইরানি শাসকদের পতন নাও হতে পারে নেতানিয়াহুর আশঙ্কা, ইরানী নেতাকে হত্যার হুমকি প্রথম ভাষণে মোজতবা খামেনির হুঁশিয়ারি : হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি সরাতে হবে ইংল্যান্ডের পেশাদার ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলবেন মোস্তাফিজ, ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় কিনল বার্মিংহাম হরমুজ প্রণালিতে আরও ৬ জাহাজে হামলা সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু: স্পিকার হলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ, কীভাবে সম্পন্ন হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া? মোজতবা খামেনি এখন কোথায়? ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতাও আক্রান্ত যুদ্ধের আকাশে নতুন মারণাস্ত্র : লেবাননে সাদা ফসফরাস, ইরানে কালো বৃষ্টি ইরান যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে? ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী, কত মানুষ এ সুবিধা পাবেন? কমনওয়েলথ সভায় বাংলাদেশ : রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু তুললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদিতে প্রাণ গেল আরও এক বাংলাদেশির বুয়েটে আবার নির্যাতনের ঘটনা : সেহরি খেতে যাওয়া ঢাবি শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে থানায় হস্তান্তর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হলেন খামেনিপুত্র মোজতোবা খামেনি, ট্রাম্প কী করবেন? লন্ডনে 'লতা দিয়া ফতা': সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ব্যতিক্রমী সেহরি আয়োজন ইতিহাস গড়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতলো ভারত সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংলাদেশি নিহত অবশেষে ভারত থেকেই গ্রেপ্তার হাদি হত্যার প্রধান আসামী মুশফিকুল ফজলসহ ইউনূস-সরকারের নিয়োগকৃত ৪ রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার ৭ মার্চের ভাষণ বাজিয়ে গ্রেপ্তার ইমিসহ তিনজন কারাগারে

পাখন্দ বিলের রক্তকমল

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৪:৪৫ এএম

পাখন্দ বিলের রক্তকমল
ছুটির দিনে সেজো খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। দুপুরে খেয়েদেয়ে ভাত ঘুমে কবে যে ঢলে পড়েছিলাম, খেয়ালই ছিল না। ফোনের ভাইব্রেশন ভূমিকম্পের মত বালিশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। চোখ না খোলেই বালিশের এপাশ ওপাশ হাতড়ে রিসিভ বাটন টিপলাম। ওপাশ থেকে সৌরভের কন্ঠস্বর আসে, কই তুই? ঘুমাচ্ছিস? আমি শব্দ দুইটা উল্টো করে তাকে জিজ্ঞেস করি, তুই কই? সে বিয়ানীবাজার ইতোমধ্যে ছেড়ে এসেছে জানার পর রেডি হয়ে বের হচ্ছি বলে ফোন রেখে দেই। গোছগাছ সেরে বের হওয়ার পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিক্সায় করে সে গন্তব্যস্থল শ্রীধরায় চলে আসলো। মুচকি হাসি বিনিময়ের পর আমরা পদ্মবিলের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করি। গ্রামের মধ্য দিয়ে চলে গেছে পিচঢালা মসৃণ পথ। বসতবাড়ির পর গ্রামের শেষভাগে পড়ল একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা। কথিত আছে, হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর তিনশত ষাট জন সফরসঙ্গীর মধ্যে আঠারো জন এখানে সমাহিত রয়েছেন। তাই জায়গাটিকে সবাই ‘আঠারো সৈয়দের মোকাম’ নামে চেনে। এই আঠারো জন আউলিয়ার মধ্যে দুই জনের কবর চিহ্নিত আছে। বাকি ষোল জনের অবশ্য চিহ্নিত নেই। মোকামে ঢুকতে গিয়ে প্রথমেই পড়ে একটি মাঝারী আকারের পুরনো পুকুর। পুকুরটিতে বিরল প্রজাতির গজার মাছ আছে। কথিত আছে, পুকুরের এসব গজার মাছ আর সিলেটে হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর মাজারের গজার মাছ একই প্রজাতির। মাছগুলোকে ‘মাদারী গজার’ নামে ডাকা হয়। মাছগুলো কেউ ধরে না। দর্শনার্থী সহ মোকামে আসা লোকজন গজার মাছগুলো দেখার জন্য তাই ভীড় জমায়। আমরা পুকুরের সিঁড়ির শেষধাপে নিঃশব্দে দাড়িয়ে পড়ি গজার মাছ দেখার আশায়। শুকনো মৌসুমে পানি কমে যায় এবং পরিষ্কার থাকে বলে সহজেই মাছগুলো দেখা যায়। তবে এখন ভরা মৌসুমে পুকুরটি পানিতে টইটুম্বুর। পানি ও ঘোলা। পুকুর পাড়ের মসজিদ আর গাছগাছালির ছায়া পড়েছে স্থির পানির ওপর। চারপাশে সর্তক দৃষ্টিতে চোখ মেলে দেখি। অপেক্ষার অবসান হতে অবশ্য কয়েক মিনিট লেগে যায়। বাঁধানো ঘাটের পাশেই ভুঁস করে মাথা তুলে বড়সড় একটি গজার মাছ। তবে ক্যামেরা তাক করার সুযোগ না দিয়েই উধাও হয়ে যায় পানির তলায়। যাবার আগে অবশ্য লেজ নাড়িয়ে আশপাশের মাছেদের ভাল ভাবে জানিয়ে যায় যে, সে এই পথে গেছে! আঠারো সৈয়দের মোকামের পর পথের দুইপাশ জুড়ে শুরু হয়েছে বিস্তীর্ণ জলাভূমি। সেই জলাভূমিটি অনেকটা হাওরের মতই বড়সড়। সিলেট অঞ্চলে বড় জলাভূমি বা হাওর-বাওড় কে ‘বন্দ’ নামে ডাকা হয়। এর নাম তাই গড়েরবন্দ। এই গড়েরবন্দের একটি বিল হল পাখন্দ বিল। পাখন্দ বিলের খ্যাতির কারণ বিলটিতে গোলাপী পদ্ম বা রক্তকমলের প্রাচুর্য্য। কিছুদূর যাওয়ার পর পেলাম পাতিহাঁসের বড়সড় একটি দল। রাস্তা দখল করে প্যাঁক প্যাঁক শব্দে ছুটে চলেছে। তার পেছনে বাঁশের কঞ্চি হাতে মধ্য বয়সী একজন লোক হাঁসগুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। হাওর-জলাঞ্চলে এরকম বড় পরিসরে হাঁস পালন বেশ চোখে পড়ে। হাকালুকিতেও দেখেছিলাম। পথের দুই ধার পানিতে টইটুম্বুর। সবখানে কচুরিপানা জমাট বেঁধে ছড়িয়ে আছে। তার মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া সর্পিল পথ। সেই পথে হেঁটে হেঁটে গিয়ে থামি আপন ভাইয়ের বাড়ির সামনে। ছড়াকার লোকমান আপন ভাই তখন বাড়িতে ছিলেন না। তবে আমরা যাব সেটা উনার বাবাকে বলে রেখেছিলেন। তাই আগে থেকেই একটা নৌকা ঠিক করে রাখা ছিল। আংকেলের সাথে কুশলাদি বিনিময়ের পর আতিথেয়তা গ্রহণ না করে উপায় থাকল না। চা নাস্তার পর আমরা বৈঠা ঠেলে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কচুরীপানার জমাট দঙ্গল ঠেলে নৌকা পাখন্দ বিল পর্যন্ত নিয়ে যেতে যেতেই শরীরের অর্ধেক তেল বেরিয়ে গেল! তবে নৌকার মাথা পাখন্দ বিলে গিয়ে ঠেকার পর সেই কষ্ট নিমেষেই মিইয়ে গেল। ছিমছাম মনোরম পরিবেশের সুন্দর এক বিল। সবখানে ফুটে থাকা গোলাপী পদ্মের মায়াবী রুপ মন কেড়ে নিল। পানির স্তর থেকে এক-দেড় ফুট ওপর পর্যন্ত ওঠে গেছে পদ্মের দন্ড। তার চূড়ায় মাথা উঁচু করে ফুটে আছে মনভোলানো পদ্মফুল। আমরা নৌকা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলাম। কোনো কোনো পদ্মের এখন পূর্ণ যৌবন। পাঁপড়ি ছড়িয়ে গোলাপী আভায় চারপাশ ভরিয়ে দিয়েছে। পাঁপড়ি গুলো ঝঁরে গিয়ে পরাগ রেণু বেরিয়ে পড়া পদ্মগুলোর সৌন্দর্য্য আরেক রকম। পদ্ম পাতার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঝঁরে পড়া পাঁপড়ি গুলো। সোনালী পরাগ রেণুতে ঝলমল করতে থাকা ঝঁরা পদ্মের রুপও চোখ জুড়িয়ে দেয়। আকাশ মুখো হয়ে দাড়িয়ে থাকা পদ্মকলি ও বলতেই পারে, আমিও রুপে কম কীসে! প্রস্ফুটিত একটি পদ্মের ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম পাঁপড়ির ভেতরে পরাগ রেণুতে মৌমাছিদের মধু আহরণে লেগে থাকতে। ভাল করে তাকাতে ফুটে থাকা প্রায় সব পদ্মের ভেতরই মৌমাছির দেখা পেলাম। ক্লোজআপ ছবি তুলতে গেলে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ভন ভন করে পালিয়ে গেল। সেই সকাল বেলা এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। পদ্মের পাতায় এখনো জমে আছে বৃষ্টির পানি। যেন অঞ্জলি পেতে কেউ পরম আদরে ধরে রেখেছে জলটুকু। ‘পদ্ম পাতার জল’ চরণটি হয়তো এমন কোন মোহনীয় দৃর্শ্য থেকে কবির লেখনীতে এসেছিল। পদ্মফুল বাংলাদেশে শরৎ থেকে শুরু করে বসন্ত পর্যন্তও একটু আধটু ফোটতে দেখা যায়। তবে জলাভূমি রাঙিয়ে রাখে শরৎকালেই। আমাদের দেশে সাধারণত দুই জাতের পদ্ম জন্মে। রক্তকমল ও শ্বেতপদ্ম। রংয়ের দিক থেকে প্রথমটি গোলাপি, অপরটি সাদা। আমাদের সাহিত্য ও সঙ্গীতে পদ্মের কথা এসেছে নানা ভাবে। তাছাড়া হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে পদ্ম পবিত্র ফুল। পদ্মের ছড়ানো পাতাগুলো বেশ বড়সড়। তার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে ছোট ছোট মাছ নড়াচড়া করতে দেখলাম। একটা দু’টা খলসে মাছও চোখে পড়ল। খলসে মাছের দুইখানা লম্বা দাড়িগোঁফ আছে। আবার রুপের মাধুর্য্য ও বেশ। ফুল ঝঁরে যাওয়ার পর পদ্মের ভেতর ক্যাপসুলের মত দেখতে বীজ ধরে। পুরো বিল জুড়ে নানা জাতের পাখির বিচরণ ছিল বাড়তি পাওনা। লম্বা গলার সাদা বক, গো-বক আর ফিঙে পাখি চারপাশে উড়াউড়ি করছিল। বিলের কোন কোন জায়গায় জলার ঘাসবন। ঘাসবনের এক জায়গায় এক পাল গরু চরতে দেখলাম। ঘাস খাচ্ছে চরে চরে। ডিঙি নৌকা ভাসিয়ে মাছ ধরার ছবিও চোখে পড়ল। গড়েরবন্দের জলাভূমি আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে আছে। ভরা মৌসুমে বিল থেকে কেউ ঘাস কাটে, কেউ মাছ ধরে, আবার সৌখিন পদ্ম শাপলা সংগ্রহকারীরা তো আছেই। পানি কমে গেলে ধানের চাষ হয়। তবে এবার কচুরীপানার আধ্যিকের কারণে অনেকেরই মুখ গোমড়া। আকাশে মেঘদলের ঘোরাঘুরি আছে। অন্যদিকে দিনানিপাত শেষ করে সূর্য যাই যাই করছে। আলো নিভে যাওয়ার আগে আগেই তাই সামনের কচুরীপানার দঙ্গল পার হওয়ার তাগাদা অনুভব করলাম। যেভাবে যাবেনঃ পাখন্দ বিলে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে বিয়ানীবাজার রুটে বাস পাবেন। শ্যামলী, রুপসী বাংলা, এনা ইত্যাদি বাস চলে এই রুটে। ভাড়া পাঁচশত টাকার মধ্যেই। এছাড়া সিলেট সদর পৌছে তারপর লোকাল পরিবহনেও যাওয়া যাবে। পৌর শহর থেকে রিক্সা বা অটোরিক্সা নিতে পারেন। ভাড়া যাওয়া-আসা মিলিয়ে যথাক্রমে দেড়শ’ ও চার-পাঁচশত টাকার মত পড়বে। রাত্রি যাপনের জন্য বিয়ানীবাজারে পাবেন হোটেল সুবিধা। ছবিঃ লেখক ও লোকমান আপন লেখক : ভ্রমণ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক এবং ব্যাংক কর্মকর্তা।