যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় মার্কিন প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবে একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলা হবে। তবে এই চুক্তি প্রকাশিত হতেই ওয়াশিংটনের কংগ্রেস থেকে শুরু করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
- চুক্তিতে কী রয়েছে?
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তির মূল লক্ষ্য সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা: ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে রফতানির জন্য আরও বেশি অপরিশোধিত তেল বাঁচানো যায়।
মার্কিন প্রভাব: এই বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তির ফলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: ওয়েস্টিংহাউস) সৌদি পারমাণবিক পরিকাঠামো নির্মাণে মূল ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি চীন বা রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বন্ধ হবে।
ইসরায়েল ইস্যু আলাদা: বাইডেন প্রশাসনের সময় এই পারমাণবিক সহযোগিতার বিনিময়ে ইসরায়েলের সাথে সৌদির কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলা এবং গাজা যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণের শর্তটি আলাদা রেখে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করছে।
- সৌদি আরব কি নিজেদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে?
রিপোর্ট অনুযায়ী, চুক্তিটি সৌদি আরবে একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কারখানা নির্মাণের পথ প্রস্তুত করতে পারে।
বিষয়টি চূড়ান্ত হবে পরবর্তী দুই বছর মেয়াদী একটি যৌথ মার্কিন-সৌদি পর্যালোচনার ওপর।
পর্যালোচনার পর সৌদি মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমোদন দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ব্যবহৃত জ্বালানির ওপর আমেরিকার নজরদারি থাকবে, যাতে সেগুলো থেকে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা না যায়।
চুক্তিটি নিয়ে বিতর্ক ও উদ্বেগের কারণ
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কর্মরত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, এই চুক্তি সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অস্ত্র প্রতিযোগিতা: সৌদি আরব পূর্বে একাধিকবার জানিয়েছে, তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হলে তারাও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের লক্ষ্যে যুদ্ধ চালাচ্ছে। এমন সময়ে সৌদি আরবকে এই সুযোগ দেওয়া দ্বিমুখী আচরণ বলে সমালোচনা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নজরদারির অভাব (IAEA Protocol): বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, এই চুক্তিতে আগের পারমাণবিক চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) 'অতিরিক্ত প্রোটোকল' বা কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
'গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড' অনুপস্থিত: সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে যখন যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের চুক্তি করেছিল, তখন আমিরাত অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল (যাকে 'গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড' বলা হয়)। সৌদি চুক্তিতে এই প্রতিশ্রুতি যুক্ত করা হয়নি।
- চুক্তিটি কি আটকে দেওয়া সম্ভব?
কংগ্রেসে বিরোধী ডেমোক্র্যাট সদস্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এটি মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শুরু করবে।
তবে মার্কিন আইন অনুযায়ী, এই চুক্তিটি ব্লক করতে গেলে মার্কিন কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রেসিডেন্টের ভেটো (Veto) বাতিল করতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।