হরমুজ প্রণালিতে গুলি করে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জন্য ইরানকে দায়ী করার পর দেশটিতে সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগের পরপরই এই হামলা শুরু হয়।
হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় (বাংলাদেশ সময় রাত তিনটা) মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা শুরু করে বলে জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, "এই অভিযানটি ইরানের চালানো অন্যায্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া।"
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির উপকূলজুড়ে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে বলেও জানানো হয়।
সেন্টকম আরও জানায়, ভূপাতিত হওয়া মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে একটি আমেরিকান সি-ড্রোন দিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে। এই প্রথম মার্কিন সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল যে, এমন অভিযানে এই ধরনের যান ব্যবহার করা হয়েছে।
"দুইজন পাইলট ছিলেন, তারা উভয়ই নিরাপদে আছেন এবং তাদের কোনো আঘাত লাগেনি। তবুও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই হামলার জবাব দিতেই হবে," সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, একটি ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানি গণমাধ্যমও এই ঘটনা নিশ্চিত করেছে। তবে ইরান বিমানটি ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করেনি বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি।
হামলার কয়েক ঘণ্টা পর সেন্টকম ঘোষণা করে যে, ইরানকে জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে। এটিকে "ইরানের অন্যায্য আগ্রাসনের আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া" হিসেবে অভিহিত করা হয়।
মার্কিন ওয়েবসাইট Axios এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে এই নতুন হামলাগুলো পরিচালিত হয়েছে।
বন্দর আব্বাস, কেশম এবং সিরিকসহ পারস্য উপসাগরের উপকূলজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
ABC Newsকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলার জন্য ইরানকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, "আমাদের হেলিকপ্টারের সাথে গত রাতে তারা যা করেছে এটি তার একটি জবাব। আমার মনে হয় এই প্রতিক্রিয়া খুবই শক্তিশালী এবং জোরালো হওয়া উচিত, আর এই হামলাটি ঠিক তেমনই।"
ওয়াশিংটনে ফিরে হাউজ স্পিকার মাইক জনসন জানান, ট্রাম্প যখন ইরানের ওপর মার্কিন হামলা পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই শীর্ষ রিপাবলিকান নেতা বলেন, "এটি যে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল তা দুঃখজনক, তবে এই পরিস্থিতি আমাদেরকে সামাল দিতেই হবে।"
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিয়ে বলেছেন যে, তারাও "কোনো হামলা বা হুমকিই বিনা জবাবে ফেলে রাখবে না।"
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যম 'এক্স' এ লিখেছেন, "যুদ্ধের ময়দানে পরাজয় সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সংকল্প পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"
"যদি নিরাপদ থাকতে চাও, তবে আমাদের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাও," তিনি আরও যোগ করেন।
ইসরায়েলি বাহিনী মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননজুড়ে হামলা চালানোর সময় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তখনই তেহরান সতর্ক করে জানায়, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা পাল্টা প্রতিক্রিয়ার নতুন ঢেউ তৈরি করবে।
মঙ্গলবার আরাঘচি বলেন, ইরানের ভূখণ্ডের কাছাকাছি বিদেশি বাহিনী "মানবিক ভুল, সাধারণ দুর্ঘটনা কিংবা ভুলবশত গোলাগুলির কবলে পড়ার কারণে সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকে।"
তিনি আরও বলেন, "ঝুঁকি কমাতে তাদের (বিদেশি বাহিনী) জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো এই অঞ্চল ত্যাগ করা।"
মঙ্গলবার হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের কয়েক মিনিট আগে সামাজিক মাধ্যমে পাল্টা বার্তা দেন— ওয়াশিংটনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ।
তিনি লিখেছেন, "আমরা কূটনীতির ভাষাকে প্রাধান্য দেই, কিন্তু আমরা অন্য ভাষাও বেশ ভালোভাবেই বলতে জানি। তোমরা যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো, তবে আমরা আমাদের আয়ত্তে থাকা সেরা ভাষায় কথা বলব।"
উল্লেখ্য, সপ্তাহজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলার পর গত এপ্রিলে যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল, তার পর আবারও একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও ইরান।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে দুই দেশকেই "তাৎক্ষণিকভাবে গুলি চালানো বন্ধ করতে" আহ্বান জানান, কারণ এতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আঞ্চলিক যুদ্ধ অবসানের সম্ভাব্য চুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়ছিল।
ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেন, ইসরায়েল ও ইরান "তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি" করতে চাইছে, কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে "অজ্ঞতা বা বোকামি" বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, "আমরা এমন একটি চুক্তির একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছি যা খুবই ভালো হবে।"
তিনি আরও জানান, এটি সম্পন্ন হতে "দুই বা তিন দিন" সময় লাগতে পারে এবং এরপর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।
এর আগে মঙ্গলবারের বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিটে ভূপাতিত অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়।
এই উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেয় US Naval Forces Central Command এবং 82nd Airborne Division। এতে US Fifth Fleet-এর Task Force 59সহ মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী সহায়তা করে।
সেন্টকমের এক মুখপাত্র BBCকে জানান, বাহরাইনভিত্তিক Task Force 59 পরিচালিত একটি unmanned surface drone (চালকবিহীন সমুদ্র যান) ক্রু সদস্যদের উদ্ধার করে।
ড্রোনটি সৈন্যদের উদ্ধার করে পানির ওপর অন্য একটি স্থানে নিয়ে যায়, যেখান থেকে পরে তাদের হেলিকপ্টারে তোলা হয়।
বাহরাইনে ‘ফিফথ ফ্লিট’ ও জর্ডানে বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলার দাবি
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর ‘ফিফথ ফ্লিট’কে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এ ছাড়া জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানস্থল হিসেবে পরিচিত একটি বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত এখনো অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ার করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন চলতে থাকলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে জাস্ক, সিরিক ও কেশম দ্বীপের কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়েছে। এতে সিরিকের বেমানি জেলায় একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে।
জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবিও করেছে আইআরজিসি। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক সদস্যরা অবস্থান করেন।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র বিমানঘাঁটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে এবং সেগুলো ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি প্রধান কমান্ড ও কন্ট্রোল কেন্দ্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিবৃতিতে বলেছে, এ অভিযান ইরানের ‘অযৌক্তিক আগ্রাসনের সমানুপাতিক জবাব’।
আইআরজিসি এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, এই অভিযানের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটির ২১টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের আকাশসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
এদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে এবং এর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসহ বিভিন্ন হুমকি প্রতিহত করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া এক পোস্টে কুয়েতের সেনাবাহিনী বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন কর্তৃপক্ষের জারি করা নিরাপত্তা নির্দেশনা ও সতর্কতামূলক পরামর্শ মেনে চলে। একই সঙ্গে শুধু সরকারি সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করার অনুরোধও জানানো হয়েছে।