তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিপরীতে করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট পুনর্বহাল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল থাকছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এই রায় ঘোষণা করেন।
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মোট তিনটি আপিল করা হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি একটি আপিল করেন এবং নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন পৃথকভাবে আরেকটি আপিল দায়ের করেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একটি আপিল করেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৬ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ মামলাটির শুনানি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হবে মর্মে মুলতবি রাখেন।
সেদিন আদালতে রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এবং ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
গত ৮ ডিসেম্বর শুনানিকালে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূইয়া পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের আবেদন জানান। এ সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “পঞ্চদশ সংশোধনীতে যদি পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকে, তাহলে তো পুরোটাই একবারেই বাতিল করা যায়।”
এদিকে গত ২ ডিসেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলে পক্ষভুক্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, “গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। এই গণতন্ত্র বিকশিত হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে তাতে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি। যার ফলশ্রুতিতে হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।” রায়ে আরও বলা হয়, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।”
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত তৎকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদ উদ্দিন। রিটকারী সুজনের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ড. শরিফ ভূঁইয়া। বিএনপির পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল। জামায়াতের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ও ব্যারিস্টার এহসান সিদ্দিকী। ইনসানিয়াত বিপ্লবের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। চার আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার জুনায়েদ আহমেদ চৌধুরী ও ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ। ইন্টারভেনর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, এই অনুচ্ছেদগুলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামো—গণতন্ত্র—ক্ষুণ্ন করেছে। এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ৭ক, ৭খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, সংশোধন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়নি। অবশিষ্ট বিধানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। আদালত বলেন, সংসদ আইন অনুযায়ী জনগণের মতামত নিয়ে এসব বিধান সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতি এবং ২৬ মার্চের ভাষণ সংক্রান্ত বিষয়ও রয়েছে।
গণভোট প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ হিসেবে থাকা গণভোটের বিধান পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে ওই সংশোধনীর ৪৭ ধারা বাতিল করে ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়।
হাইকোর্টের রায়ে ৭ক, ৭খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল বা স্থগিতকরণকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ ছিল, ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধান সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা হয়েছিল। ৪৪ (২) অনুচ্ছেদে সংসদের মাধ্যমে অন্য আদালতকে হাইকোর্টের কিছু ক্ষমতা প্রদান করার বিধান ছিল, যা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
পরে গত ৮ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে দেওয়া রায়ের ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
এরপর গত ৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করা হয়, যেখানে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের আবেদন জানানো হয়। রিটকারী সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এই আবেদন করেন। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে বিষয়টি শুনানিতে আসে।
এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ নভেম্বর বহুল আলোচিত এই মামলায় আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত।
-
প্রাইমারিতে জিয়া, খালেদা ও তারেকের ৩ বই রাখার নির্দেশ
-
সাংবাদিক আনিস আলমগীর, সোমা ইসলামসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় অভিযোগ
-
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জাতীয় চিড়িয়াখানায় ‘বাদশা বাহাদুর’
-
প্রধানমন্ত্রীর অফিস সময়কে ‘লোক দেখানো শোপিস’ বলায় প্রধান শিক্ষক বরখাস্ত
-
যুক্তরাষ্ট্রের গম আমদানিতে টনপ্রতি ২৪ ডলার বেশি দিচ্ছে বাংলাদেশ