একজন স্কুল শিক্ষকের ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে ট্রোল, থানায় অভিযোগ, পুলিশি তদন্ত এবং প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সম্ভাব্য কমিটি গঠনের আলোচনা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নাটকীয় পরিস্থিতি।
সবশেষ সোমবার বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায়।
ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে এক সময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ড 'ডিফারেন্ট টাচ'-এর 'শ্রাবণের মেঘগুলো' গানের সঙ্গে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর জেরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গান ব্যবহার করে নিজেদের প্রোফাইলে ভিডিও পোস্ট করতে থাকেন, যা মূলত মিজ পালের প্রতি সংহতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।
পরিস্থিতি এক পর্যায়ে এতটাই আলোচিত হয়ে ওঠে যে, বিউটি পালের ভিডিও পোস্ট করা ‘সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি’ লঙ্ঘন করেছে কিনা তা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
তবে সোমবার সিলেট সফরে গিয়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ আলোচিত ভিডিওটি নিয়ে মন্তব্য করেন যে, তার জানা মতে এতে 'অশ্লীলতা বা তেমন কিছু নেই।'
এই মন্তব্যের পরই সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ তাদের পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
সোমবার রাতে সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যটা তো আপনি লক্ষ্য করেছেন, এরপর তো আর আমাদের কোনো কথা থাকে না"।
কী ছিল ভিডিওতে
ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি পাল ২৩শে জুলাই নিজের ফেসবুক পেজে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও প্রকাশ করেন।
ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ডে আশির দশকের জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ডিফারেন্ট টাচের গান 'শ্রাবণের মেঘগুলো'র একটি অংশ শোনা যায়। সেখানে দেখা যায়, শাড়ি পরিহিত অবস্থায় বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে হাঁটছেন তিনি।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সমালোচনা ও ট্রোলের মুখে পড়েন।
সাইবার হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর তার সহকর্মীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার পাশে দাঁড়ান।
সংহতির অংশ হিসেবে তারা নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে একই গানের অংশ ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশ করতে থাকেন। কেউ বিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীসহ ভিডিও ধারণ করেন, আবার কেউ বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে ভিডিও পোস্ট করেন।
সব ভিডিওতেই একই গান ব্যবহার করা হয় এবং ভিডিওগুলোর ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয় যে, বিউটি পালের প্রতি হওয়া সাইবার হয়রানির প্রতিবাদে তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
থানায় জিডি
নিজের প্রোফাইলে ভিডিও পোস্ট করার পরদিন শুক্রবার, ২৪শে জুলাই ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বিউটি পাল।
ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফর রহমান জানান, তার পোস্ট 'অতিরঞ্জিত'ভাবে প্রচার করা হচ্ছে—এ অভিযোগেই তিনি জিডি করেন।
ওসি লুৎফর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "উনার একটি পোস্ট কেউ কেউ অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে এবং তার ফলে তিনি বিব্রত বোধ করছেন বিধায় তিনি অভিযোগ করেছেন। কে বা কারা এটি করেছে সেটি বের করার জন্য তিনি পুলিশের কাছে এই অভিযোগ দায়ের করেছেন"।
তিনি আরও জানান, বিউটি পাল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি।
পুলিশ তার অভিযোগের ভিত্তিতে IT Forensic বিভাগের সহায়তা চেয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষা বিভাগের ‘ইউটার্ন’
বিউটি পালের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক শুধু সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি তার কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।
ভিডিওটি ঘিরে আলোচনা শুরু হলে সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠনের চিন্তা করেছিল।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ বিবিসিকে বলেন, "আমরা চিন্তা করেছিলাম যে এটি (ভিডিওটি) সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নীতিমালা লঙ্ঘন করে কী-না, আমরা তা খতিয়ে দেখবো।"
তবে রবিবার দুপুরের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
সোমবার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের পর মিজ পালের বিষয়টি আর তদন্ত করা হবে না বলে জানান তিনি।
"মাননীয় মন্ত্রী যখন একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, তারপর তো আমাদের এ বিষয়ে করার কিছু নাই", বলেন তিনি।
কী বলেছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী
সোমবার সিলেট সফরের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, তিনি ভিডিওটি নিজে না দেখলেও জেনেছেন এতে 'অশ্লীল' কিছু নেই।
"আমার সোশ্যাল মিডিয়া নেই, কাজেই আমি ভিডিও দেখিনি। আমি আশেপাশে জিজ্ঞেস করে জানলাম, একজন একটা গান গেয়ে একটি ভিডিও করেছে এবং সেখানে অশ্লীলতা বা তেমন কিছূ নেই।
যদি না থাকে, গান গাওয়া অন্যায় এটা আর কেউ মানুক বা না মানুক, আমি মানতে রাজি না।"
-
২০ জেলায় নারী ডিসি, ১৯১ উপজেলায় ইউএনও নারী
-
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন কি পদত্যাগ করছেন : উত্তরসূরি নিয়ে জোর আলোচনা
-
নৈতিক স্খলন: গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করল জামায়াত, এমপি পদও ঝুঁকিতে
-
গাড়িতে সিট বেল্ট নেই বা কানে ফোন? রাজধানীতে মামলা দেবে এআই ক্যামেরা!
-
২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণা: খরচ কত, কী সুবিধা জানাল সরকার