ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ ছিল এক ব্যতিক্রমী রাজ্য।
দেশের রাজনীতিতে মোদীর জয়যাত্রা যখন হিন্দি বলয় পেরিয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে একের পর এক শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করছিল, তখনও দৃঢ় অবস্থানে টিকে ছিল পশ্চিমবঙ্গ।
নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও যুক্তিবাদী মননের জন্য পরিচিত এই রাজ্য বারবার মোদীর অগ্রযাত্রাকে আটকে দিয়েছে। তবে সোমবারের বিধানসভা নির্বাচনের ফল সেই স্থবিরতা ভেঙে দিয়েছে।
মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ভারতের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দুর্গ শেষ পর্যন্ত মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সুনামিতে ভেসে গেছে। ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৮টি জিতে প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠনের পথে বিজেপি।
১০ কোটিরও বেশি মানুষের এই রাজ্যে ভোটারের সংখ্যা জার্মানির মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ফলে এই নির্বাচন কেবল একটি রাজ্য নির্বাচন নয়, বরং একটি দেশের সরকার গঠনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মোদীর ১২ বছরের শাসনামলে এই জয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু তিন মেয়াদের জনপ্রিয় এক নেত্রীর পরাজয় নয়, বরং পূর্ব ভারতে বিজেপির দীর্ঘ ‘লং মার্চ’-এর চূড়ান্ত সফলতা।
লেখক ও সাংবাদিক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “বিজেপির জন্য বাংলা জয় একটি বিশাল সাফল্য, প্রতিশ্রুতির এমন এক ভূমি যা দীর্ঘদিন তাদের নাগালের বাইরে ছিল।”
গত অর্ধশতকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র একবার। ৩৪ বছর বাম শাসনের পর ১৫ বছর প্রভাব বিস্তার করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বাংলাকে একটি ‘হেজেমোনিক’ বা একক আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে দেখেন, যেখানে সাধারণত একটি দলই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই জয় হঠাৎ নয়, বরং দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল।
সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মা জানান, বিজেপি গত তিনটি নির্বাচনে প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এবার তা বেড়ে ৪৪ শতাংশের বেশি হয়েছে, যা তাদের জয়ের পথ সুগম করেছে।
আশ্চর্যের বিষয়, তৃণমূলের মতো শক্তিশালী তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন না থাকা সত্ত্বেও বিজেপি এই বিপুল সমর্থন অর্জন করেছে। তাদের এই উত্থানের পেছনে কাজ করেছে ৫ ‘ম’।
১৫ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মা, মাটি, মানুষ’—এই তিন ‘ম’-এর মাধ্যমে বাম শাসনের অবসান ঘটান। সেই স্লোগানই টানা তিনবার নির্বাচনী জয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
তবে এবারের নির্বাচনে সেই ভিত্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন করে পাঁচটি ‘ম’—মুসলিম, মহিলা, অভিবাসী (মাইগ্র্যান্ট), মতুয়া সম্প্রদায় এবং বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র (মেশিনারি)—মমতার জয়ের ধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
১. নারী ভোটার
তৃণমূলের মূল শক্তি ছিল নারী ভোট। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্প এই ভোটব্যাংক ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
তবে ২০২৬ সালে মোদী নারী-কেন্দ্রিক নানা সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন। বিশেষ করে আরজি কর মেডিকেল কলেজে নারী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারীর নিরাপত্তা প্রশ্নে তৃণমূলকে চাপে ফেলে বিজেপি এবং ভুক্তভোগীর মাকে পানিহাটি আসন থেকে প্রার্থী করে।
২. মুসলিম ভোট
পশ্চিমবঙ্গে ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার নির্ধারক।
২০২১ সালে ৩৫ শতাংশের বেশি মুসলিম অধ্যুষিত ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টি জিতেছিল তৃণমূল। তবে ২০২৬ সালে মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যায়। উন্নয়ন, ভোটার তালিকা ও সুশাসন নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তৃণমূল জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে ভরসা করছে। অন্যদিকে কংগ্রেস পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করছে। এছাড়া আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল এআইএমআইএম সম্ভাব্য ‘ভোট কাটার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
৩. অভিবাসী ভোটার
অভিবাসীরা এবারের নির্বাচনে অনিশ্চিত ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা ও নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রয়োজনীয়তায় বহু শ্রমিক বাড়ি ফিরে আসেন। তাদের অংশগ্রহণ ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
৪. মতুয়া সম্প্রদায়
পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। এই বড় ভোটব্যাংক বিজেপিকে রাজ্যে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসে। এবারও তাদের সমর্থন জয়ের বড় কারণ।
৫. বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র
তৃণমূলকে টেক্কা দিতে বিজেপি তাদের সংগঠনকে নতুনভাবে সাজায়। কেন্দ্র ও রাজ্য নেতৃত্বের সমন্বয়, বুথ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাঠ পর্যায়ের সক্রিয়তাও তাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহ্যগতভাবে ‘ক্যাডার-চালিত’ রাজ্য, যেখানে সংগঠিত কর্মী বাহিনী রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। বিজেপি এই কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভানু জোশী বলেন, “মমতার দীর্ঘ সাফল্য নির্ভর করত জনকল্যাণ ও সংগঠনের ভারসাম্যের ওপর। কিন্তু সেই সংগঠনই এক সময় তার প্রধান দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। ভোটাররা এখন সরকারি সুবিধাকে রূপান্তরকারী পরিবর্তনের চেয়ে বরং রুটিন বিষয় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।”
অন্যদিকে জোশীর মতে, “বিজেপির মূল কৌশল ছিল তৃণমূলের প্রতি মানুষের তৈরি হওয়া বিতৃষ্ণাকে হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের একটি তীক্ষ্ণ ভাষায় বদলে দেওয়া। ফলে এটি কেবল জনকল্যাণের ব্যর্থতা নয়; বরং এটি এমন এক বাস্তবতা যেখানে সরকারি সুবিধা বা দলীয় সাংগঠনিক জোর, কোনোটিই উগ্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের স্রোতকে রুখে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ছিল না।”
মোদীর পর অমিত শাহ?
পশ্চিমবঙ্গে এই জয় ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
বাংলার মতো শক্তিশালী রাজ্যে এককভাবে বিজেপির এই জয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আরও অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।
এটি কেবল মোদীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অবস্থানও দলের ভেতরে আরও শক্তিশালী করেছে।
এই জয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নে অমিত শাহকে যোগী আদিত্যনাথ, নীতিন গড়করি ও রাজনাথ সিংয়ের তুলনায় এগিয়ে রাখতে পারে।
দশকের পর দশক পশ্চিমবঙ্গ ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্রোতকে প্রতিরোধ করে এসেছে।
অবশেষে বিজেপি সেই দুর্ভেদ্য আঞ্চলিক দুর্গে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছে। এটি শুধু একটি যুগের অবসান নয়, বরং মোদী যুগের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
-
ওমানে মর্মান্তিক মৃত্যু: বিয়ের কেনাকাটায় গিয়ে প্রাণ হারালেন চট্টগ্রামের ৪ ভাই
-
ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় লেবাননে নিহত বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার, আরেকজন নিখোঁজ
-
নিউইয়র্কে ইন্তেকাল করেছেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কামাল আহমদ
-
রোমে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বৈশাখী উৎসব
-
ফ্লুসি ডিক্রি জটিলতা নিরসনে ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক