স্থানীয় সরকারে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা
বাংলাদেশে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সবার দৃষ্টি।
তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সরকারের প্রকৃত আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপও এই সন্দেহকে আরও জোরদার করেছে।
প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়ার পর সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংসদের বিরোধী দলগুলোর দাবি, দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন হওয়ার আগেই স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকারি দল।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন জরুরি?
জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনার পতনের পরপরই স্থানীয় প্রশাসনের কাঠামো ভেঙে পড়ে।
সে সময় অনেক জনপ্রতিনিধি হামলার শিকার হন, কেউ গ্রেফতার হন, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। ফলে স্থানীয় সরকারে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়।
এছাড়া প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের কোথাও সরকারি কর্মকর্তা, কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দেড় বছর ধরে চলা এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থানীয় প্রশাসনকে কার্যত অচল করে রেখেছে।
এ কারণে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
বিরোধীদের সন্দেহ
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলো দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসছে।
সরকারও ইতিবাচক বার্তা দিলেও সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি পৃথক বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানায়।
তাদের অভিযোগ, ভোট ছাড়াই দলীয় নেতাদের নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি।
বিরোধীদের মতে, এটি ভবিষ্যৎ নির্বাচন ‘নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী’ আয়োজনের প্রস্তুতির অংশ।
সরকার কী বলছে
বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রশাসন সচল রাখতেই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তার বক্তব্য:
"নানা ভুল ধারণা নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। পরবর্তীতে আর কোনো প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে না, সবগুলোতেই নির্বাচন হবে।"
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সময় নিয়ে তিনি বলেন—
"নির্বাচন আয়োজনে তিনমাস সময় নেবে সরকার।"
আরও বলেন—
"নির্বাচন ছাড়া হবে না, নির্বাচন অবশ্যই করা হবে। তবে এ মুহূর্তে করার কোনো পরিকল্পনা নাই, আমরা একটু সময় নিতে চাই। তবে, বড়জোর তিনমাস সময় নিতে পারি আমরা।"
নির্বাচন কবে, কীভাবে?
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে।
পরিকল্পনা:
- প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
- এরপর উপজেলা পরিষদ
- তারপর পৌরসভা নির্বাচন
- সবশেষে জেলা পরিষদ নির্বাচন
মন্ত্রী জানান—
"ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হবে। এরপর উপজেলা ও পৌরসভা। জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ওগুলোতে নির্বাচন একটু পরে হবে।"