ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
ঢাকা ৩ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
সর্বশেষ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা: দুই বছর পর জাবির ১২ শিক্ষককে শাস্তি দিল্লি বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুললেন ডা. জাহেদ উর রহমান ইরান-মার্কিন শান্তি চুক্তি নিয়ে অস্বস্তিতে ইসরায়েল, ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কে টানাপোড়েন ব্রাজিলের দুঃসংবাদ: গ্রুপ পর্বে খেলতে পারছেন না নেইমার, অনিশ্চয়তা বাড়ছে বিশ্বকাপ ঘিরেও বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য যুক্তরাজ্যের নতুন ভিসা সহায়তা, মিলবে ৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দিল্লিতে প্রবেশে বাধা: কী পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ কেমন খেলল ব্রাজিল : মরক্কোর কাছে হোঁচট, ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু ট্রাম্পের দাবি আজই চুক্তি সই, ইরানের ভিন্ন সুর আর্জেন্টিনার খেলা কখন, কবে, কার সঙ্গে—পূর্ণ সূচি ও সম্ভাব্য পথচিত্র ব্রাজিলের খেলা কখন, কবে, কার সঙ্গে—পূর্ণ সূচি ও সম্ভাব্য পথচিত্র মারা গেছেন পপ আর্টের কিংবদন্তি ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী ডেভিড হকনি টরন্টো বাংলা পাড়া টুর্নামেন্ট: টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন বিয়ানীবাজার বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ : কোন ম্যাচ কখন ,কোথায় অনুষ্ঠিত হবে? ৩০ বছর পর সালমান শাহর দেহাবশেষ তোলার আদেশ হেলিকপ্টার হারিয়ে ইরানে মার্কিন হামলা, বাহরাইন ও জর্ডানে পাল্টা হামলা ইরানের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন ইসরায়েলে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ইরানের সঙ্গে যুক্ত হলো হুতিরা বিশ্বকাপ ২০২৬: ফেভারিট কারা, চমক দেখাবে কোন দল? শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ : কোন দেশের খেলা কখন—জেনে নিন রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ১৯ দিনের মাথায় সোহেল-স্বপ্না দম্পতির ফাঁসির রায় হোয়াইট হাউসের কাছে ফের গুলি, বন্দুকধারী নিহত ট্রাম্প কি ইরান যুদ্ধে হারছেন? হামে প্রতিদিন গড়ে ৭ শিশুর প্রাণহানি : রাজশাহী থেকে যেভাবে দেশজুড়ে ছড়াল লন্ডনে বাবু-রুপাসহ গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ম : গ্রিন কার্ড পেতে বিদেশিদের দেশে ফিরতে হবে হামে শিশু মৃত্যু বাড়ছেই: টিকার ঘাটতি নিয়ে ইউনিসেফের ৫ চিঠিতেও সতর্ক হয়নি ইউনূস সরকার শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকার : গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে দেশে ফিরব আ.লীগের ব্যাক করা নিয়ে মাহফুজের পোস্ট, যা লিখলেন প্রবাসীকে বাসায় ডেকে হত্যা: প্রেমিকার হাতে ভয়াবহ খণ্ডিত লাশ তনু হত্যা মামলায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য: ডিএনএ পরীক্ষায় আরও এক পুরুষের রক্ত শনাক্ত

 ডোন্ট গেট ওল্ড

প্রকাশিত: ০৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:১১ এএম

 ডোন্ট গেট ওল্ড
বৃটেনের  অন্যতম বড় ও আধুনিক প্রযুক্তির হাসপাতাল- রয়েল লন্ডন হসপিটাল এ ইমারজেন্সি বিভাগে এক্স রে ইউনিটে বসে আছি। শরীর এমনিতেই খারাপ।তার উপর খুব দুর্বল লাগছে। হাটতেও পারছিনা। তবুও দ্বিতীয়বার আসতে হলো। এক্স রে করে নার্স বলেছে- এই ওয়েটিং ইউনিটে , ডাক্তারের  জন্য অপেক্ষা করতে। হাসপাতালটি খুব গোছানো,পরিপাটি,সৃজনশীল সুন্দর। ওয়েটিং চেয়ারে আমি একমাত্র বসে আছি। আশপাশে চারজন পেশেন্ট বেডে শুয়ে আছেন। হাসপাতাল, রক্ত, ইনজেকশনে আমার মারাত্নক ফোভিয়া আছে। এরই মাঝে আমি বসে আছি।বাইরে আজ হীম ঠান্ডার সাথে প্রচন্ড ঝড় বাতাস। জিরো ডিগ্রী কোট থেকে মুঠো ফোন বের করে পুরনো ছবি দেখছি। -হ্যাপি নিউ ইয়ার।উইশ ইউ হেভ লাভলী টাইম। আমি কিছুটা চমকে তাকাই। চোখ যায় সামনের বেডে। দেখি একজন বৃদ্ধা বেড থেকে আমার দিকে চেয়ে আছেন এবং আমাকে উদ্দেশ্য করেই  বলছেন। আমি বৃদ্ধার দিকে চেয়ে মায়াময় স্মিথ হাসি। মনে হলো  বৃদ্ধা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। আমার ধারণা তাঁর আশি বা ছুই ছুই বয়স হবে। এবার তার মুখে যেন খই ফুটতে শুরু করেছে- বাংলায় তার তরজমা হলো- বাইরে কি খুব ঠান্ডা, না স্বাভাবিক। ক্রিসমাসে এবারও নাকি স্নো পড়েনি।তুমি কি দেখেছ? নিউ ইয়ার্স ইভ সেলিভ্রেশন কি টিভিতে দেখেছিলে না বাইরে আনন্দ করেছ? -আমি কিছুটা ভড়কে যাই। তারপর বলি- আজ বাইরে প্রচন্ড বাতাস বইছে।হ্যাঁ, এবারও ক্রিসমাস ছিল স্নো বিহীন।গত বছরের মতো আঁতশবাজি ছিল। বাসায় টিভিতে দেখেছি, নতুন কিছু নেই বলে মনে হয়েছে। বুঝা যাচ্ছে বৃদ্ধার শ্বাস কষ্ট আছে।একটু সময় নিয়ে বললেন, ধন্যবাদ তোমাকে।ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালে আছি,কিছুই জানিনা। আমার ছেলে জন ফ্রান্সে থাকে। গতবার বলেছিল এই ক্রিসমাসে আসবে, এবারও আসেনি। গতবছর ছিল স্বামী এডামের সাথে শেষ ক্রিসমাস, এডাম আমার আগেই মারা গেল! এখন বাসায় একা থাকি। হাসপাতালে আমাকে কেউ দেখতে আসেনি। ধন্যবাদ তোমাকে। বলতে গেলে আমি ব্যাথায় অনেকটা কাতর। পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা তার সাথে মাথা ঘুরচ্ছে। কয়েকদিন থেকে ঘুমও যেন ছুটিতে গেছে। বৃদ্ধা দম নিয়ে আবারও কথা বললেন- এখানে  ডাক্তার নেই। কেউ আসবে বলেও মনে হয় না। তুমি কী এখানে থাকবে? শ্বাস কষ্ট নিয়েও তিনি কথা বলেই যাচ্ছেন। বললাম, ডাক্তার বলেছে এক্স রে রিপোর্ট দেখে আমার সাথে কথা বলবে। নার্স এখানে বসতে বলেছে। আমার ডান দিকে বেডে অবচেতনভাবে আছেন আরেক বৃদ্ধা। ব্যাথায় কাতরাচ্ছেন। শক্তিহীন কণ্ঠে নার্সকে ডাকছেন, নার্স, পেইন কিলার প্লিজ –বার বার উচ্চারণ করছেন তিনি।মনে হচ্ছে ব্যাথায় ঘুরে মধ্যেই কথা বলছেন। তার ঠিক পেছনের বেডে একজন বৃদ্ধ । অক্সিজেন লাগানো।আমার চোখে চোখ পড়তেই যেন আটকে গেল- শুধু চেয়ে আছেন,হয়তো কোন কিছু বলতে চাচ্ছেন,পারছেন না। আমি এক সময় চোখ নামিয়ে নিলাম। একটু পরে আবার চেয়ে দেখি- তিনি অপলকে আমার দিকে চেয়ে আছেন। আরেকজন বৃদ্ধ একই লাইনে পেছনে।সম্ভবত তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, নাক ডাকার শব্দ শুনা যাচ্ছে। একজন নার্স  তার পায়ের নিচের বালিটটা নিদৃষ্ট জায়গায় আবার বসিয়ে দিয়ে ইউরিন ব্যাগটি খালি করছেন। আগের বৃদ্ধা আমার মনযোগ নিতে জিঙ্গেস করলেন- এখন কটা বাজে? বললাম কোয়াটার পাস থ্রি। বিনয় নিয়ে বললেন-থ্যাংকস। শুধু জানতে চাইলাম আরকি! এখানে সময়, দিন গুনতে নেই।বিশেষ করে আমার মতো বৃদ্ধদের। আমি এবার কোন কথা বলিনা। প্রমিত হাসি ছড়িয়ে আই কনট্রাক -এ থাকি। তিনি বললেন, তুমার কি ফ্যামলি আছে। আমি বলি- হ্যা।পরিবারের কথা  একটু কথা তবে একলাইনে বলি।না বললে অভদ্রতা দেখায়,তাই বলা। মনে হলো এই বলাও বিব্রত অবস্থা  ডেকে আনল। তিনি ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন। কি করবো আমি বুঝে উঠতে পারছি না। তার চাপা কান্না বাড়ছে,হাতের টিস্যু দিয়ে মুখ চেপে ধরেছেন। অসুস্থতার জন্য এমনিতেই হাটতে পারছিনা। কিন্তু পারলেও এদেশে অজানা পেশেন্টদের কাছে যাওয়ার নিয়ম নেই। ব্যক্তিগত প্রাইভেসির বিষয়টি বৃটেনের ডাইভার্স সোসাইটি এবং যে কোন প্রফেশনে সর্বোচ্চভাবে মেনে চলতে হয়। বৃটেনে কনফিডেনশিয়ালিটি  ও ডাটা প্রটেকশন এ্যাক্ট খুবই কার্যকর,  কাজের অভিজ্ঞতা থেকেও জানি। এবার পাশের বেডের বৃদ্ধা নিরব স্বরে বলতে লাগলেন- ইউ আর লাকি, ডোন্ট গেট ওল্ড, সান! পাশের কামরা থেকে নার্স এসে বৃদ্ধার মাথায় হাত রেখে বললেন- ম্যারি, বলছিনা এসব নিয়ে না ভাবতে, প্লিজ। আমরা তো আছি। এখানে আমরাই তোমার স্বজন,পরিবার। ইউ অল আওয়ার সানশাইন। বলতে গেলে আমি কিছুটা অস্বস্তি থেকে মুক্তির চেষ্টায় আছি। এশিয়ান নার্স আমার কাছে এসেছে নিছু স্বরে বললেন, ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার কথা আমি শুনছিলাম। ডাটা প্রটেকশন এ্যাক্ট এর কারণে আর কিছু বলতে পারবোনা। শুধু বলে রাখি- ওদের স্বজন আছে, অনেকের পরিবারের সদস্যও আছেন, কিন্তু কেউ তাদের দেখতে আসেননি অনেক দিন। তাই  তাদের মন খুব খারাপ থাকে সব সময়। এখানে অনেকক্ষণ তাদের হয়তো থাকতে হতে পারে, কারণ হঠাৎ লিফটি খারাপ হয়ে গেছে।আপনার সঙ্গ তাদের আবেগে  ইতিবাচক নাড়া দিয়েছে। আমি কষ্ট লুকিয়ে, হাসি ছড়িয়ে নার্সকে বললাম- আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ। রোগীদের আন্তরিক সেবা, সঙ্গ দেবার জন্য। পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা করছে, হাটতে পারছিনা। বসেই ডাক্তারের অপেক্ষায়ি আছি। এক্সট্রা কেয়ার  ও সেলটেড একোমোডেশন সার্ভিসে দীর্ঘ দিনের কাজের অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে এরকম অসংখ্য অনুভূতি কথা জমে আছে।বলতে গেলে  প্রবীনদের দেখলে  অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। আভিজাত্য,চাকচিক্য, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে বৃটেনের সমাজ ব্যবস্থার ভিতরের চিত্রটি ভালো করে জানি কাজের মাধ্যমেই। তাদের দেখলে পারিবারিক-সামাজিক বন্ধনের ভিতরের ক্ষতগুলো মূলত সামনে ভেসে উঠে। একটু পরেই  ডাক্তার আমাকে দেখেন। পরবর্তি চিকিৎসা ও নির্দেশনা দেন। পাশে থাকা একজন নার্স   আমাকে ইন্ট্রাগ্রাম একাউন্ট দেখিয়ে বললেন- এটা আপনি, নাহ! আমি মুগ্ধতা ছড়িয়ে হাসতে চেষ্টা করি। ডাক্তার, নার্সদের মন ভালো করা অনুভূতি নিয়ে বাইরে আসতেই  মনে ধাক্বা লাগে। চারটি হাসপাতাল বেডে শুয়ে আছেন অসুস্থ চারজন বৃদ্ধ।মূলত মূল ক্যাবিন থেকে এখানে পোর্টাররা নিয়ে এসেছেন টিসি স্ক্যান, এক্স রে ইত্যাদির জন্য। আমি তাদের দিকে তাকাচ্ছি। অদ্ভুদ ব্যাপার –দেখি তিনজন বৃদ্ধই আমার দিকে চেয়ে আছেন। আমি ভালো মানুষ না। সমাজে আমার অবদানও নেই। অনুভূতি প্রকাশে শব্দ নিয়ে একলা একলা খেলি। তবে এরকম দৃশ্যে আমার কেন জানি চোখে জল আসে। আমাদের পাঁচজনের   দূরত্ব কয়েক গজের। পাশের বেডের অন্যজন আবার ডাকলেন নার্সকে। তাকে পাশ বদলিয়ে দেবার জন্যে। নার্স তাকে ওপাশ করিয়ে দিলেন। যেন এতেই মহা খুশী,কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন বার বার ধন্যবাদ দিয়ে। আমি এবার উঠে দাড়াই। ইস্ট লন্ডনের বাসা থেকে হাসপাতালের দূরত্ব  খুবই কম। সুস্থ অবস্থায় হেটে আসলে ৭/৮ মিনিট লাগে। এখানে একা এসেছি বলতে গেলে সাহস করেই। পনের দিন পরিবারের সবাই দেশের বাইরে ছিলাম।বাসায় সবাই স্বর্দি-জ্বরে আক্রান্ত। খুড়িয়ে খুড়িয়ে বাসার উদ্দেশ্যে বের হতে হবে হাসপাতাল থেকে। পরে না হয় টেক্সি  ডাকবো। আমি তাদের দিকে চেয়ে আছি। কিছু বলতে পারছি না। বৃদ্ধ মেরী বললেন,ভেরি কাইন্ড এন নাইস অব ইয়্যু।টেক কেয়ার, সান। পাশেরজন মনে হলো অনেক কষ্টে বেড থেকে মাথা একটু তুলে বললেন, স্পেন্ড টাইম উইথ ইয়্যর ফ্যামলি।যে বৃদ্ধ ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন,তিনি এখনও ঘুমাচ্ছেন। অপরজন বললেন, নাইস চ্যাপ। ডোন্ট গেট ওল্ড, স্মাইল ওলয়েজ। আমি মুখ লোকাতে চাইছি, এতক্ষণে চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। নার্সের হাত নাড়ার দৃশ্যের সাথে হাসার চেষ্টা করে লিফটের দিকে হাটতে থাকি….। আহারে জীবন। মানুষ। স্নেহ-মায়া-বন্ধন।সম্পর্ক।ভালোবাসা। নি:সঙ্গতা। লিফট আটতলায় এসে দরজা খোলার শব্দটি  জানিয়ে  দিচ্ছে- জীবন দৌড়ে আমাকে এবার উঠতে হবে। আশ্চর্য, লিফটে শুধু আমি। গ্রাউন্ড ফ্লোর বাটনে টিপ দিয়েছি। লিফট নিচের দিকে নামছে তার নিয়মে। আর আমার কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছে- ডোন্ট গেট ওল্ড…  । স্পেন্ড টাইম উইথ ইয়্যর ফ্যামলি… আ নো য়া রু ল  ই স লা ম  অ ভি : কবি, সাংবাদিক ৪ জানুয়ারী ২০২৪, লন্ডন