জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে
ইরান ও ইসরায়েলের একে অপরের গ্যাসক্ষেত্র লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং লাফিয়ে বাড়ছে তেলের দাম। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
তেল ও গ্যাসের দামে বড় উল্লম্ফন
বিশ্ববাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের বাজারেও গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
যুক্তরাজ্যে গ্যাসের দাম দ্বিগুণের পথে
যুক্তরাজ্যে গ্যাসের দাম গত ফেব্রুয়ারির শেষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে দেশটিতে পাইকারি গ্যাসের দাম ২৩ শতাংশ বেড়ে ১৭২ পেন্স-এ দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে সাধারণ মানুষের ঘরোয়া গ্যাস বিল অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা
ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও তাদের আক্রমণ জোরদার করেছে। ইরানের হামলায় কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম এই এলএনজি স্থাপনাটি বর্তমানে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া জ্বালানি জায়ান্ট শেল জানিয়েছে, তাদের পার্ল জিটিএল (গ্যাস-টু-লিকুইড) কেন্দ্রেও আগুন লেগেছিল, যা পরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। অন্যদিকে, আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানি হামলার মুখে তারা হাবশান গ্যাস স্থাপনা এবং বাব তেলক্ষেত্রের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি
এই উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি পুনরায় কাতারে হামলা চালায়, তবে তিনি ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেবেন।
শেয়ারবাজারে ধস
জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। জাপানের নিক্কেই ৩.৪ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ২.৭ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং ২ শতাংশ কমেছে। ইউরোপের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ এবং জার্মানির ড্যাক্স সূচক ২ শতাংশের বেশি পতন রেকর্ড করেছে।
তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা
ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট সুজানা স্ট্রিটার বলেন, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা আবারও ফিরে এসেছে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ এখন কাতারের এলএনজি-র ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, কারণ তারা রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে।
মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়বে
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, জ্বালানির এই উচ্চমূল্য বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আরএসএম ইউকে-র প্রধান অর্থনীতিবিদ থমাস পিউ জানান, জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে গ্রীষ্মকাল নাগাদ মুদ্রাস্ফীতি ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিমান ভাড়াও বাড়তে পারে
লুফথানসার মতো বড় ইউরোপীয় বিমান সংস্থাগুলো জানিয়েছে, জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে বিমানের ভাড়াও বাড়বে। তারা যাত্রীদের আগেভাগে টিকিট বুক করার পরামর্শ দিয়েছে।
জ্বালানি ও লজিস্টিক খাতে ঝুঁকি
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স-এর প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মিড বলেন, সচল গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রথম হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও লজিস্টিক সিস্টেম, যেমন রফতানি টার্মিনাল, বন্দর এবং অফশোর অবকাঠামো সবই ঝুঁকির মুখে।
তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো এখন আর নিরাপদ নয়। চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ বেশ কিছু দেশ তাদের জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে কেবল অর্থ প্রদান বা জাতীয় পরিচয়ে যে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে, এমন ধারণাকে সতর্কতার সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।